ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সহজে মাঠ ছাড়ছেন না ইমরান খান

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল, ২০২২ ৫:৩১ : পূর্বাহ্ণ

রাজনীতিবিদ ইমরান খানের উত্থানের মতো তাঁর ক্ষমতাচ্যুতিও ছিল চমকপ্রদ। দেশটির ক্রিকেট দলের এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ তাঁর অধিনায়কত্বেই জেতা। আর তিনিই পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি অনাস্থা ভোটে হেরেছেন।

খেলা সরাসরি সম্প্রচার হবে, এটাই স্বাভাবিক। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয় যারা দেখেছেন, তাদের স্মৃতিতে তা এখনো উজ্জ্বল। কিন্তু পাকিস্তান তো বটেই, কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর অনাস্থা ভোটে হেরে যাওয়ার দৃশ্য ইতিপূর্বে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে, তার কোনো নজির নেই। তাও আবার মধ্যরাতে!

যাই হোক—এক মাসের উত্তেজনা, গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত নানা নাটকের পর শুরু হয় ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। এ সময় পদত্যাগ করেন দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদের স্পিকার আসাদ কায়সার ও ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি।

পদত্যাগের আগে আসাদ কায়সার বলেন, ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় আমি অংশ নিতে পারি না। তাই আমি পদত্যাগ করছি। পরবর্তী সেশন পরিচালনার জন্য প্যানেল চেয়ারম্যান আয়াজ সাদিককে আহ্বান করছি।’

মুসলিম লীগ (এন)-এর সাংসদ আয়াজ সাদিক স্পিকারের চেয়ারে বসেই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়ে অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া শুরু করেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ০২ মিনিটে অনাস্থা ভোট শুরু হয়। সংসদের একটি গেটে রাখা একটি রেজিস্ট্রার খাতায় উপস্থিত সাংসদেরা একে একে নিজেদের নাম লিখতে থাকেন। রাত ঠিক ২টার সময় অনাস্থা ভোটের ফল ঘোষণা করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার আয়াজ সাদিক। পরিষদের ৩৪২ ভোটের মধ্যে অনাস্থা ভোটের পক্ষে ১৭৪টা ভোট পড়ে। ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য দরকার ছিল ১৭২ ভোট। অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে মাত্র ২ ভোট বেশি পেয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

নতুন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় পরিষদের সদস্যদের ভোটে আজ সোমবার দেশটির ২৩তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ-শরিফ (পিএমএল-এস) চেয়ারম্যান শাহবাজ শরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) তরফে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সদ্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশিকে।

পিটিআইয়ের শর্ত

দুর্নীতির অভিযোগে শাহবাজ শরিফের প্রধানমন্ত্রী পদের আবেদন গ্রহণ না করতে পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পিটিআই। যা ইতিমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন পরিষদের সচিব। কিন্তু শাহবাজের মনোনয়ন বাতিল করা না হলে, পিটিআইয়ের সব সাংসদ পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ফুয়াদ চৌধুরী। যা নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

ইসলামাবাদের আবাসিক এলাকা বানি-গালায় ইমরান খানের বাস ভবনে গতকাল রোববার পিটিআইয়ের কোর এক্সিকিউটিভ কমিটির (সিইসি) বৈঠক শেষে ফুয়াদ এ ঘোষণা দেন। বৈঠক শেষে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেন, ‘আমাদের নতুন সংগ্রাম শুরু হলো। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নতুন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে পিটিআই।’ তা ছাড়া আজ ইসলামাবাদে বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে পিটিআই।

আদালতের ঘণ্টা

ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরির অনাস্থা ভোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন সংবিধান সম্মত হবে না, তা জানতে চেয়ে গত শনিবারেই সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন করেছে পিটিআই। তা আজ গ্রহণ করতে পারে সুপ্রিম কোর্ট।

অন্যদিকে, শাহবাজ শরিফ ও তাঁর ছেলে হামজা শরিফের বিরুদ্ধ একটি বিশেষ আদালতে চলমান দুর্নীতি মামলার শুনানি হওয়ারও কথা আজ সোমবার। তাঁদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

অর্থনীতি

বিরোধীদের মূল দাবি, অর্থনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি নতুন সরকার কতটা চাঙা করতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। হিন্দুস্তান টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, গড় আয় বাড়ানো, দ্রব্যমূল্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা, জ্বালানি সংকট সমাধান, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। অল্প সময়ে নতুন সরকার কতটা কী করতে পারবে, তা বলা দুষ্কর। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ না কমলে, নতুন সরকারের বিরুদ্ধে সহজে জনমত গড়ে তুলতে পারবে পিটিআই।

অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক আলী রিয়াজ নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বিরোধীরা ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পেরেছেন, তাদের জন্য এটা হয়তো বড় অর্জন। কিন্তু দেশের বেহাল অর্থনীতির পাশাপাশি, বিরোধীদের ঐকমত্য এতটা শক্তিশালী নয়, নড়বড়ে। তিনি আরও লিখেছেন, নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়লে—অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বিদেশি ষড়যন্ত্র ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে ইমরান খান সহিংস পথে হাঁটতে পারেন।

আন্তর্জাতিক চাপ

পশ্চিমে আফগানিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন, পূর্বে ভারত নিয়ে ভূরাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ পাকিস্তান। এসব প্রতিবেশীর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ইত্যাদির সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই, উত্তপ্ত বিশ্ব পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি দক্ষ হাতে পরিচালনা করা দরকার।

কিন্তু এ দুই ক্ষেত্রেই দেশটির সেনাবাহিনী বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। ফলে, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে ইসলামাবাদ আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।

Print Friendly and PDF
ব্রেকিং নিউজঃ