ঢাকা, রবিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বই ভাড়া দিয়ে লাখো পাঠকের ‘বইদাদু’ তিনি

প্রকাশ: ১২ মার্চ, ২০২২ ২:২০ : পূর্বাহ্ণ

অর্থের অভাবে স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি। তারপরও বইয়ের সঙ্গে সখ্যতার কোনো কমতি ছিল না তার। জীবিকার প্রয়োজনে অল্প বয়সেই নামতে হয় আয়-রোজগারের পথে। কিন্তু বই সংগ্রহের নেশার কারণে বারবার বদলাতে হয় পেশা।

শেষে পুরোনো বই কেনার ঝোঁক আর বইপড়ার নেশা মাথায় চেপে বসে তার। এক সময় তার সংগ্রহশালা কিছুটা বাড়লে অন্যদের বই পড়তে দিতে শুরু করেন। আর এ জন্য নিতেন নামমাত্র বই ভাড়া। তিনি লক্ষাধিক পাঠক তৈরি করেছেন। গল্পটি ‌‘বইদাদু’ হিসেবে পরিচিত রংপুরের ওমর শরীফের।

 

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বইয়ের সঙ্গে মিশে থাকা জীবনগল্পের কথা জানান ৭০ বছর বয়সী ওমর শরীফ। শৈশব থেকেই ছিলেন বইপোকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ দাশসহ বাংলা সাহিত্যের প্রধান লেখকদের অধিকাংশ বই তার পড়া। এমনকি উইলিয়াম শেকসপিয়র, ম্যাক্সিম গোর্কি, টলস্টয়ের বইও আছে তার পাঠ্য তালিকায়।

ছেলেবেলায় টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বই কেনার শখ তার পরবর্তী জীবনে বজায় থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে থমকে যায় ওমর শরীফের পড়ালেখা। এরপর দেশ স্বাধীন হলেও আর স্কুলের বারান্দায় পা পড়েনি তার। বরং জীবনের বাঁকে বাঁকে নানা প্রতিকূলতারে সঙ্গে লড়তে হয় তাকে। শুরুতে নিজে কাপড়ের ব্যবসা করলেও পরে কাজ নেন পণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু বই সংগ্রহের পেছনে ছুটতে গিয়ে হাতছাড়া হয়ে যায় চাকরি।

ওমর শরীফ জানান, ২০০১ সাল থেকে নিজের বই পড়ার আগ্রহটা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পুরাতন বই সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। সেই বই নিয়েই তার ঠাঁই হয় শহিদ জররেজ মার্কেটে। দীর্ঘদিনের চেনাজানা বই ব্যবসায়ী রুহুল আমিন তাকে নিজের দোকানের একটি অংশ ছেড়ে দেন। তাও আবার বিনামূল্যে। এরপরই শুরু হয় পাঠকের সঙ্গে তার বই লেনদেনের সম্পর্ক।

ওমর শরীফের দোকানে এপার বাংলা, ওপার বাংলাসহ দূরদেশের লেখকদেরও বই রয়েছে। রয়েছে গল্পসমগ্র, উপন্যাস, কবিতা ও আত্মজীবনীমূলক বই। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বই ছাড়াও উল্লেখযোগ্য লেখকদের কালজয়ী সব পুরোনো বই রয়েছে। শুরুতে মাত্র দুই টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার পাঠককে বই ভাড়া দিতেন ওমর শরীফ। এভাবেই শুরু তার বইয়ের ব্যবসা, যা আজও থামেনি।

 

এখন অবশ্য বইয়ের প্রকারভেদে তা বেড়ে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। পাঠকদের আগ্রহ বাড়াতে কখনো বিনিময় ছাড়াও বই দেন তিনি। আবার কারো যদি বই পড়ে ভালো লাগে, তাহলে সেই বইয়ের ভাড়ার টাকা ফেরত দেন। তার কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া বই কেউ ফেরত নাও দিতে পারেন। তবে অধিকাংশ পাঠকই ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বই ফেরত দিয়ে নতুন করে বই নিয়ে যান বলে জানান তিনি।

বই এবং পাঠকের প্রতি ওমর শরীফের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় অভিভূত সবাই। এখন তার ভান্ডারে আছে প্রায় পাঁচ হাজার বই। তবে আগের মতো ওমর শরীফের দোকানে পাঠকের ভিড় নেই। তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহে পাঠকের হাতের মুঠোয় বই পৌঁছালেও হতাশ নন ওমর শরীফ। বরং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বইয়ের প্রতি অদম্য আগ্রহ তাকে পরিচিত করেছে ‘বইদাদু’ নামে।

তার প্রেরণায় রংপুর সিটি করপোরেশনের বিপরীতে শহিদ জররেজ মার্কেটে একটি দুটি করে প্রায় অর্ধশত দোকান গড়ে উঠেছে। এই মার্কেটের পুরোটাই এখন পুরোনো বইয়ের হাট। যেখানে সুলভ মূল্যে মিলছে সব ধরনের বই। জররেজ মার্কেটে ঢুকতেই হাতের ডানদিকে চোখে পড়বে কমদামি বই মেলা। সেখানে দোকানের ভেতরে এক কোণে হাজারো বইয়ে ডুবন্ত ওমর শরীফ। তার বয়স ৭০। মাথার চুলে সাদা মেঘ ভর করেছে। এই বয়সে তিনি গেয়ে চলেছেন জীবনের গান। প্রতিদিন পাঠকের মাঝে ফেরি করছেন জ্ঞানের আলোকশিখা।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে ওমর শরীফ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। এর আগে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও দেখেছি। পাকিস্তান আমলে রংপুর শহরের মুলাটোল পাঠশালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি। এরপর ভর্তি হই জিলা স্কুলে। সেখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আর স্কুলে যাওয়া হইনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় পড়ালেখা।

তিনি জানান, বর্তমানে মুলাটোল এলাকাতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তার সংসারে স্ত্রী ও দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। বই ভাড়া আর বিক্রি থেকে সামান্য যে আয় হয় তাতেই কোনো রকমে সংসার চলছে ওমর শরীফের। নিজের জীবনের গল্প শোনানোর চেয়ে বিভিন্ন লেখকের গল্প-উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিনী আর আত্মজীবনীর বই মানুষকে পড়ানোই তার মূল উদ্দেশ্য।

ওমর শরীফ জানান, নিজে পড়া শেষ হলে আরেকজনকে পড়তে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বই ভাড়া দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। এ কারণে অন্য কোনো পেশায় নিজেকে স্থির করতে পারেননি। পুরোনো বই ভাড়া দেওয়ার শুরুটা যতটা রমরমা ছিল, এখন তা আর নেই। ঠিক কত লোক তার কাছ থেকে বই নিয়ে পড়েছেন তার হিসাব নেই। তবে সংখ্যাটা লক্ষাধিকও হতে পারে। পুরোনো এসব বইয়ের দাম মূল্য তালিকা থেকে অর্ধেক ধরা হয়। এই অর্ধেক টাকা জামানত হিসেবে জমা দিয়ে যে কেউ বই নিয়ে যেতে পারেন। বইটি ফেরত দেওয়ার সময় জামানতের পুরো টাকাই ফেরত দেওয়া হয় পাঠককে।

তিনি জানান, এক সময় বিভিন্ন বইয়ের দোকানের সামনে ঘুরতেন। সেখানে বইপ্রেমী কেউ এলে পুরোনো বই বিক্রি করবেন কি না জানতে চাইতেন। কোথাও সন্ধান পেলে ছুটে যেতেন তাদের বাড়িতে। কম দামে বই কিনে আনতেন। আবার পুরোনো কাগজ-বিক্রেতা বা ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকেও বই কিনতেন। এভাবে সংগ্রহ করতে করতে বইয়ের এই বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলেন। এখন তার কাছ থেকে বই পড়ে কেউ কিছু জানতে পারলে ভালো লাগে, তিনি আনন্দিত হন। বইয়ের প্রতি নেশা থেকেই তিনি এই কাজ করছেন।

স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তার সংগ্রহশালার পাঠক। আগে দিনে ৫০-৭০ জনের বেশি পাঠক মিললেও এখন তা কমে এসেছে। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন ১৫-২০ জন পাঠক বই আদান-প্রদান করেন।

ওমর শরীফের সঙ্গে আলাপচারিকতার ফাঁকে তার দোকানে কয়েকজন পাঠকের দেখা মিলল।

কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যায়নরত আহমেদ আপু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভালো লাগার দিক থেকেই দাদুর কাছ থেকে বই নেওয়া। তার মতো বইপ্রেমী খুব কম দেখেছি। প্রায় চার বছর ধরে বই নিই। বহু লেখকের বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। দাদু শুধু বই-ই দেন না, কোন পাঠককে কী ধরনের বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে, তাও ভালো জানেন।

রংপুর সরকারি সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমান মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, বন্ধুদের কাছ থেকে বইদাদুর কথা শুনেছি। বই ভাড়া দেওয়া এবং বই বিক্রির পদ্ধতিটা বেশ ভালো লেগেছে। এ কারণে তার কাছ থেকে বই নিতে আসা। ভাড়ায় বই দেওয়া, আবার বই পড়ে ফেরত দিলে টাকা ফেরত দেওয়ার এই সিস্টেমটা রংপুরে অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।

বদরগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে রংপুরে বইদাদুর দোকানে প্রায়ই আসেন আশরাফুজ্জামান বাবু। পেশায় তিনি গণমাধ্যমকর্মী। তবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি নাটক, গল্প, ছড়া-কবিতা, গানও লেখেন তিনি। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, দাদু দীর্ঘ দিন ধরে নামমাত্র ভাড়ায় বই দিয়ে পাঠকদের সহযোগিতা করছেন। আমি যে কোনো বইয়ের প্রয়োজনে আগে তার কাছে আসি। দাদুর সংগ্রহে অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য বই রয়েছে, যা অন্য কোথাও সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।

যার সহযোগিতায় শহিদ জররেজ মার্কেটে ওমর শরীফের ঠাঁই হয়েছে, তিনি কম দামি বইমেলা দোকানের মালিক রুহুল আমীন। কয়েক মাস আগে তিনি মারা গেছেন। এখন তার ছেলেরা বইয়ের ব্যবসা করছেন। তাদের একজন রাজু আহমেদ।

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, দাদুর বই পড়ার আগ্রহ দেখে আমার বাবা তাকে দোকানের একটি অংশ বিনামূল্যে দিয়েছেন। সেখানে দাদু নিজে বই পড়েন এবং ভাড়াও দেন। প্রতিদিনই সেখানে পাঠক আসছে। দাদু শুধু বই-ই দেন না, ভালো বই সম্পর্কে জানেন এবং সেগুলো পড়তে উৎসাহিত করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, শুধু বই-ই নয় পাঠকের প্রতিও ওমর শরীফের অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। তা না হলে একুশ বছরে লক্ষাধিক পাঠক সৃষ্টি হতো না। তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণেরা নামমাত্র ভাড়ায় বই পড়তে পারছেন। এতে যেমন পাঠাভ্যাস বাড়বে, সঙ্গে তরুণদের মধ্যে বই সংগ্রহের অভ্যাসও গড়ে উঠবে।

Print Friendly and PDF
ব্রেকিং নিউজঃ